বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬, ০৫:৩২ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক॥
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে পদোন্নতি নেওয়া, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগী ও বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধানে এসব তথ্য জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, তাজুল ইসলাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে চাকরি শুরু করেন। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ২০১৩ সালের ১৪ নভেম্বর অফিস সহায়ক পদ থেকে সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি নেন। তার বিরুদ্ধে জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে ওই পদোন্নতি নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সাংঘাইল গ্রামের মৃত ফজল হকের ছেলে তাজুল ইসলাম তিন ভাই ও তিন বোনের মধ্যে বড়। একসময় পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। তার বাবা চট্টগ্রাম জুট মিলে সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। পরিবারের অন্য সদস্যরাও কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পরবর্তীতে আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় পরিবারের কয়েকজন সদস্য বিদেশে পাড়ি জমান।
অভিযোগ রয়েছে, ১৯৯০ সালে দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের সহায়তায় তাজুল ইসলাম শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে এমএলএস পদে মাস্টার রোলে চাকরি পান। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই বিভিন্ন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে নারায়ণগঞ্জে বদলি হলে সেখানে আরও শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
জানা গেছে, তিনি বঙ্গবন্ধু পেশাজীবী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিজের, ছেলে ও ভাইদের নামে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের একাধিক ঠিকাদারি লাইসেন্স তার ও তার স্বজনদের নামে নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব লাইসেন্স ব্যবহার করে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বহু মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তাজুল ইসলাম। দেবপাল এলাকার এক ভুক্তভোগীর দাবি, তার ছেলেকে কম্পিউটার অপারেটর পদে চাকরি দেওয়ার কথা বলে ১২ লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে চাকরি না হওয়ায় টাকা ফেরত চাইলে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও সন্ত্রাসী দিয়ে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তিনি প্রভাব খাটিয়ে নতুন সরকারের এক শিক্ষামন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে আগের মতোই কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে তাকে মানিকগঞ্জ শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরে বদলি করা হলেও ঢাকায় থেকেই প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তার বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন শিহাব উদ্দিন ও আনোয়ার হোসেন লিটন। তবে অভিযোগকারী কামাল হোসেন মজুমদারের দাবি, অর্থের বিনিময়ে অভিযোগটি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় থেকে তাজুল ইসলাম বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের পর তিনি নতুন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে নিজ এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং প্রভাব ধরে রাখতে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, শাহরাস্তির সাংঘাইল এলাকায় “সাংঘাইল যুব সমাজ” নামে একটি সংগঠন গঠন করে সেখানে নিজেকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। এছাড়া সাংঘাইল কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের কমিটি দখল করে নিজের অনুসারীদের নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
সম্পদের বিষয়ে স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাজধানীর রায়েরবাগ এলাকায় তার চারটি বাড়ি রয়েছে। এছাড়া নীলক্ষেত ইসলামিয়া মার্কেটে চারটি দোকান, গুলিস্তানের সুন্দরবন স্কয়ারে দুটি দোকানসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট, বাড়ি ও শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে এলাকাবাসী ও সচেতন মহল তাজুল ইসলামের সম্পদের উৎস, জাল সনদ ব্যবহার করে পদোন্নতি, ঠিকাদারি কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অর্জিত সম্পদের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোঃ তাজুল ইসলাম কয়েক বার ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।